জীবন থেকে নেয়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জীবন থেকে নেয়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১২ জুন, ২০১০

জুরাইনে দুই শিশু সন্তানসহ মায়ের আত্মহনন

 
 

Sent to you by জন via Google Reader:

 
 

via প্রজন্ম ফোরাম by dummy@example.com (ইমরান্) on 6/12/10

http://jugantor.info/enews/issue/2010/06/12/51730_1.jpg

রাজধানীর কদমতলীর জুরাইনে সাংবাদিক শফিকুল কবিরের পুত্রবধূ ও দুই নাতি-নাতনীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, মা দুই সন্তানকে বিষ খাইয়ে হত্যার পর আন্তহত্যা করেছেন। তবে ঘটনাটি রহস্যজনক। আÍহত্যার রহস্য উদঘাটন করতে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক টিম অনুসন্ধান চালাচ্ছে। মৃত্যুর আগে দুই শিশু সন্তান ও মা বাসার দেয়ালে লিখে গেছেন- তাদের মৃত্যুর জন্য আব্বু, দাদা, দাদী ও ফুফুরা দায়ী। তাদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আমরা আন্তহত্যার পথ বেছে নিয়েছি। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট ও একটি মোবাইল ফোন সেট উদ্ধার করেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ২২৯ নম্বর নতুন জুরাইনের তৃতীয় তলার বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে সাংবাদিক শফিকুল কবিরের পুত্রবধূ ফারজানা কবির রিতা (৩৫) এবং তার দুই সন্তান ইসরাফ কবির বিন রাশেদ ওরফে পাবন (১১) ও রাইসা রাশমিন পায়েলের (১০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনটি লাশই ফ্লোরে জাজিমের ওপর পড়া ছিল। এ সময় লাশের ওপর থেকে একটি চিরকুট ও একটি মোবাইল ফোন সেট উদ্ধার করে পুলিশ। রিলাক্সিন ও সেডিল জাতীয় ওষুধের খামও পাওয়া যায় লাশের পাশে। ওষুধগুলো তাদের নিজস্ব প্রাইভেট কার চালক আল-আমিনকে দিয়ে দোকান থেকে আনা হয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য এসেছে। লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে এলাকার লোকজন ও পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। উৎসুক লোকজনের ভিড় সামলাতে বেগ পোহাতে হয় পুলিশকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এসে বিভিন্ন রুম থেকে আলামত সংগ্রহ করেন। পাবন ও পায়েল ধানমণ্ডি মাস্টার মাইন্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ষষ্ঠ ও পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ত। বাসার গৃহকর্মী জিন্নাত আরা বেগম জানান, প্রায় ১৮ বছর ধরে এ বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করে আসছিলেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে বাসায় এসে মাংস, মাছ ও ডাল রান্না করেন। বিকাল ৩টার দিকে গৃহকর্ত্রী রিতা তাকে বলেন, রাতে আর আসতে হবে না। পরদিন সকালে এলে চলবে। তার কথামতো শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে বাসায় এসে দেখা যায়, মূল দরজা খোলা। বেডরুমে খালা ও তার দুই সন্তান ঘুমিয়ে আছে। আগের দিনের রান্না করা সবকিছুই ডাইনিং টেবিলে পড়ে আছে। সবাইকে ডাকাডাকি করার পর কোন শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি আরও বলেন, রিতা খালার হাত ধরে ডাকাডাকি করার পরও কোন সাড়াশব্দ না এলে তার সন্দেহ হয়। বিষয়টি আশপাশের লোকজনকে অবহিত করলে সবাই বাসায় আসে। পরে তাদের লাশ দেখে পুলিশে খবর দেয়া হয়। এক প্রশ্নের জবাবে জিন্নাত আরা বেগম জানান, প্রায় সময় রিতা ও তার স্বামী রাশেদুল কবিরের মধ্যে ঝগড়া হতো। প্রায় সময় রিতা ও তার দুই সন্তানকে মারধর করতেন রাশেদুল। সংসারে কোন শান্তিই ছিল না। জানা গেছে, রাশেদুল কবির গাড়ির ব্যবসা করেন এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করেন। তার স্ত্রী রিতা গৃহিণী। শুক্রবার সকালে বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তৃতীয় তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকেন রাশেদুল কবির ও তার স্ত্রী-সন্তানরা। নিচতলায় থাকেন সাংবাদিক শফিকুল কবির, তার স্ত্রী ও এক কন্যা সন্তান। তৃতীয় তলা ভাড়া দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় তলায় ৪টি বেডরুম রয়েছে। প্রতিটি রুমে এয়ারকন্ডিশনার আছে। ডাইনিং রুমসহ ৪টি বেডরুমের দেয়ালে রং পেন্সিল দিয়ে লেখা রয়েছে। প্রতিটি লেখার নিচে পাবন ও পায়েলের নাম উল্লেখ করা হয়। যে রুম থেকে লাশ উদ্ধার করা হয় ওই রুমে রিতা তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি ও ননদের উদ্দেশে কিছু কথা লিখে যান। ড্রয়িং রুমে টেলিভিশন, ল্যাপটপ, সোফাসহ অন্যান্য আসবাবপত্র ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে। পায়েল ও পাবনের স্কুলের বই-খাতাগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। একটি দেয়ালে পায়েল লিখেছেÑ 'আমি, আমার মা ও আমার ভাই অনেক নোংরামি সহ্য করেছি। দুনিয়ায় আর কেউ সহ্য করে নাই। এখন সহ্য করার পালা তোদের। আমাদের মৃত্যুর জন্য বাবা রাশেদুল কবির দায়ী।' আরেকটি দেয়ালে পাবন লিখেছেÑ 'মাথা নিচু করে বাঁচার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো, কারণ মাথা নিচু বাঁচা যন্ত্রণার ব্যাপার। তাও আফসোসÑ তোমাদের লজ্জা-শরম আগে থেকেই নাই। তাও বললাম যে, মাথা নিচু করে বাঁচা কি একটা যন্ত্রণার জিনিস। জানি এসব বলে কোন লাভ নেই। তাও বললামÑ।' আরেকটি রুমের এক কোনায় লেখা ছিলÑ 'ওই দাদা, তুই না সাংবাদিক? এবার তোর বাসার দেয়ালে পত্রিকা ছাপাইয়া দিলাম। তুই সব সময় তোর ছেলেমেয়ের কথা বলিস। আমরা দুই ভাইবোন ও মায়ের কথা একবারও বলিস না।' বাথরুমের ফ্লোরেও নানা বিষয়ে লেখা ছিল। বেডরুমের এক কোনায় রিতা লিখে যানÑ '১৮ বছর ধরে রাশেদুল কবির তোমাকে ভালোবেসে গিয়েছি। এই স্মৃতি আর ধরে রাখতে পারলাম না। দুই অবুঝ সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক অত্যাচার সহ্য করেছি। তার পরও বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আদরের ধন পায়েল ও পাবনকেও সঙ্গে নিয়ে গেলাম। আমাদের মৃত্যুর জন্য তুমিই একমাত্র দায়ী।' বাবার উদ্দেশে পাবন আরও লিখেছেÑ 'আব্বু, তুমি বলেছিলে যে, ৫০ বছর হইলেও তুমি স্মৃতিকে (আপত্তিকর ভাষা) বিয়ে করে দেখাবে। আমার মাকে বলেছিলে, তুমি চলে যাও। এটাও বলেছ যে, পাবন-পায়েল তোমার পেটে আসছে বলে আমার ঘৃণা লাগে।' পাশের রুমের মেঝেতে লাল রং দিয়ে বড় বড় হরফে আরেকটি লেখাÑ 'আমাদের জীবনের কিছু মানুষ আছে, যারা আমাদের জীবন নষ্ট করেছে, তারা হচ্ছেÑ শফিকুল কবির (দাদা), রাশিদুল কবির (বাবা), সুকন কবির (ফুফু) ও নূর বানু কবির (দাদি)। আমি হয়তো বলতাম যদি আমার চেহারা আর রক্ত বলতে পারতাম। মানুষ যেমন বলে, রক্ত কথা বলে, তাই তো আমি তোমাদের মতো কারও সঙ্গে বেইমানি বা মিথ্যা বলতে চাইনি। মরতে মরতে একটা আফসোস হচ্ছে যে, আমি তোমাদের বংশে জন্মেছি। আর তোদের রক্ত নিয়ে মরতেছি।' পায়েল লিখেছে 'সুকন কবির, তোর আর তোর মেয়ের মেঘনার বাড়ি দরকার তো? বাঁচিয়ে দিয়ে গেলাম। আমাদের দুই ভাইবোনের রক্ত খাইয়ে বড় করে দেখ শান্তি নাকি। তুই বলেছিস না, তুই মরলে তোর মেয়ে বড় হয়ে আমাদের খাওন শিখাবে। তোর বাড়ি দরকার, তোকে বাড়ি দিয়ে গেলাম।' একটি লেখা সাংবাদিক দাদুকে উদ্দেশ করে লিখেছে পাবন 'আম্মু তার বাবাকে দেখে নাই। আম্মুর আদর্শ মানুষ ছিল তার দাদা। তুমি কেন ভালো শ্বশুর হতে পারলে না? তুমি কেন ভালো দাদা হতে পার না? ১৮ বছর আগের কথা নিয়ে তোমরা কেন কথা বলছ। বর্তমানে আমার বাপ যা করছে তা নিয়ে কেন কথা বল নাই? আমার ভাবতেই ঘৃণা লাগে। আমার বাবা বিয়ে না করলে আমাদের জীবনটা আজ এমন হতো না। ফুফুরা, তোমরা বলেছিলে আমরা রাস্তায় গিয়ে ভিক্ষা করতে। কিন্তু না, বংশের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হতে দেব না। এজন্য মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছি।'
কেন দাম্পত্য কলহ : ছয়-সাত বছর আগে রাশেদুল কবির তার মামতো বোন স্মৃতিকে নিয়ে আসে বাসায়। ওই বাসায় থেকেই সে লেখাপড়া করে। এক পর্যায়ে রাশেদুল স্মৃতিকে ভালোবাসে। দুই বছর আগে গোপনে রাশেদুল স্মৃতিকে বিয়ে করে। এ খবর রিতা জানতেন না। স্মৃতিকে বিয়ের পর থেকেই রিতার ওপর চালান নির্যাতন। কেন নির্যাতন করা হচ্ছে তা জানতে চান রিতা। কিন্তু রাশেদুল তাকে বলতেন, তুই তোর বাবার বাড়ি চলে যা। তোর সঙ্গে আর সংসার করতে চাই না। ৬ মাস আগে রিতা জানতে পারেন, যে স্মৃতিকে বোনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছেন, তাকে তার স্বামী বিয়ে করেছেন। স্মৃতিকে নিয়ে ইস্কাটন এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করে আসছিলেন। মাঝেমধ্যে রাশেদুল বাসায় এসে রিতা ও তার দুই সন্তানকে মারধর করতেন। রাশেদুলকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালান রিতা। কিন্তু তিনি বার বার ব্যর্থ হন।
আÍীয়-স্বজনের কথা : নিহত রিতার ভগ্নিপতি কাজী মোহাম্মদ আরিফ জানান, ১৮ বছর আগে রিতা ভালোবেসে বিয়ে করে রাশেদুলকে। তাদের সুখের সংসার ছিল। হঠাৎ করে স্মৃতিকে বাসায় আনার পর সবকিছু উলটপালট হয়ে যায়। স্মৃতিকে বিয়ের পর তাকে বাসায় আনার চেষ্টা চালায়। গত ৬ মে কিছু পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে একটি বৈঠকও হয়েছিল। রাশেদুল বখাটে প্রকৃতির ছেলে। তার বাবা মা ও বোনরা ডাইনীর ভূমিকা পালন করে। তাদের বারবার বলার পরও কোন সুরাহা করেনি। তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে রাশেদুল ও তার পরিবারের সদস্যরা রিতার কাছ থেকে জোর করে একটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়। ওই স্ট্যাম্পে লেখা ছিলÑ স্মৃতিকে বিয়ে করার ব্যাপারে তার কোন আপত্তি নেই। জুন মাসের মধ্যে সে বাসা ছেড়ে দেবে। সঙ্গে সন্তানদেরও নিয়ে নেবে। অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে রিতা তার দুই সন্তানকে নিয়ে আÍহত্যা করেছে। এ মৃত্যুর জন্য রাশেদুল এবং তার বাবা-মা ও বোনরা দায়ী। বিশেষ করে রাশেদুলের বোন সুকন কবির এ বাড়িটি দখল করতে চায়। রিতার বড় বোন ফাহমিদা আরিফ মিতা জানান, চলতি মাসের ৯ তারিখে পায়েল ও পাবনের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়। বাচ্চাদের স্কুলের যাতায়াতের সুবিধার জন্য রিতা কলাবাগান এলাকায় বাসা নিতে চেয়েছিল। ইতিমধ্যে বাসা থেকে কিছু আসবাবপত্র নিয়েছিল রিতা। কিন্তু এর আগেই তো তারা আল্লাহর কাছে বড় বাসা নিয়েছে। স্মৃতিকে বিয়ে করার পর থেকেই রাশেদুল ও তার পরিবারের সদস্যরা রিতা ও দুই সন্তানের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। আÍহত্যার সঙ্গে আর কেউ জড়িত কিনা সে ব্যাপারে তদন্ত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, শফিকুল কবির ও তার স্ত্রী রিতার ওপর অভিমান করে বাসা থেকে সোনারগাঁ চলে যান। ইচ্ছা করলে তিনিই এসব সমস্যার সমাধান করতে পারতেন। রিতার আÍহত্যার জন্য রাশেদুলই দায়ী। রিতা ও দুই নাতি-নাতনীর লাশ দেখে বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়েন মা মাজেদা বেগম। তার আহাজারিতে পুরো হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, রাশেদুল ও তার বাবা-মা-বোনরা এজন্য দায়ী। স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ৬ মাস আগে রিতা একবার আÍহত্যার চেষ্টা চালায়।
সাংবাদিক শফিকুল কবিরের বক্তব্য : শফিকুল কবির জানান, দাম্পত্য কলহ মেটানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ছেলে রাশেদুল ও রিতার জন্য তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাদের ঝগড়াঝাটি এড়াতে ওই বাসা থেকে গ্রামের বাড়িতে পর্যন্ত চলে আসি। রিতা আমার আদরের দুই নাতি-নাতনীকে হত্যা করে নিজে আÍহত্যা করে। স্মৃতিকে বিয়ে করার খবর পেয়ে রিতা মানসিক ভারসাম্যহীন হীন হয়ে পড়ে। দুই শিশু সন্তান খুবই মেধাবী ছিল। তারা কিছুতেই আÍহত্যা করতে পারে না। স্বামী-স্ত্রী কেন বারবার ঝগড়ায় লিপ্ত হতো তা তারাই ভালো বলতে পারবে। তিনি আরও বলেন, জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রিতার মামা আব্বাসের উপস্থিতিতে একটি সালিশ বৈঠক হয়। ওই সালিশে সিদ্ধান্ত হয়েছিলÑ রিতা ও তার দুই সন্তান আলাদাভাবে থাকবে। ভরণপোষণসহ সবকিছু রাশেদুল বহন করবে।
পুলিশের বক্তব্য : ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) তওফিক মাহবুব চৌধুরী যুগান্তরকে জানান, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। কেমিক্যাল জাতীয় বা ঘুমের ওষুধ খেয়ে তারা আÍহত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। দেয়ালে লেখা সম্পর্কে তিনি বলেন, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনজন লিখেছিল বলে মনে হয়। লাশের সিম্পটম ও লেখা দেখে মনে হচ্ছে, আগ থেকেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আÍহত্যা করার। তিনি আরো বলেন, রাশেদুল ও স্মৃতিকে গ্রেফতার করতে পুলিশের কয়েকটি টিম কাজ করছে। এজাহারে কাউকে আসামি করলে তদন্তের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

যুগান্তর

পুলিশ কি পারবে প্রকৃত অপরাধীদের খুজে বের করে এর দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে ?


 
 

Things you can do from here:

 
 

শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১০

লাশ বানিজ্য পদক-১

“করিম শেখ ।
প্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষক। কিছু জমি জিরেত আছে। চাষবাস করে যৎসামান্য টাকা আসত। সে বছরটা প্রচন্ড খরা গেল, ফসল সব পুড়ে ছাই। স্কুলের বেতন কি আর নিয়মিত পাওয়া যায়! তার স্ত্রী একটা ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন। এই ব্যাংকে আবার মহিলাদের সদস্য হতে হয় এবং সেই সদস্যের নামেই ঋণ পাওয়া যায়।
করিম শেখের ধারণা ছিল, ফসল উঠলে কিস্তির টাকাসহ জমা দিয়ে দেবেন। করিম শেখ ফসলের মাঠের দিকে তাকিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলেন! ব্যাংক থেকে লোক এসে বেশ ক-বার হুমকী দিয়ে গেছে, সময়মতো টাকা শোধ না দিলে এর পরিণাম ভালো হবে না।

করিম শেখ হুমকীর ভয়ে কাবু নন। ব্যাংকের লোকজনরাও নিশ্চয়ই খোঁজখবর রাখে, তিনি একজন শিক্ষক। ৭ গ্রামে তাকে ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত হয় না। কিন্তু তিনি নিজেই লজ্জায় মরে যাচ্ছিলেন, মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করে! গ্রামে, স্কুলে জানাজানি হলে কি উপায় হবে! বাচ্চার মায়ের গায়েই বা ক-ফোঁটা গহনা! অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন জমি বিক্রি করে দেবেন, এ ছাড়া আর গতি নেই।

সে দিন ছিল হাটবার। করিম শেখ হাটে গিয়েছিলেন। ব্যাংকের লোকজনরা পুলিশসহ এসেছিল। করিম শেখের স্ত্রী বারংবার কাতর অনুরোধ করছিলেন, বাচ্চার বাপ বাড়ীতে নাই, হাটে গেছে; ফিরুক, নিশ্চয়ই কোন একটা ব্যবস্থা হবে।
এরা কান দিল না। ব্যাংকের লোকদের এক কথাঃ টাকা তো আমরা বাচ্চার বাপকে ধার দেই নাই তোমাকে দিয়েছি, তুমি পরিশোধ করবা।
করিম শেখের স্ত্রী এক্ষণ টাকা পাবেন কোথায়? সমস্ত গ্রামের মহিলারা এ বাড়ীতে জড়ো হয়েছেন; পুরুষরা বেশীরভাগই হাটে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে। মহিলাদের হা হুতাশে কান দেয় কে! এরা করিম শেখের একটা গরু , কয়েক বস্তা ধান, করিম শেখের স্ত্রীর হাতের সরু তারের দুইটা রুলি নিয়ে নিল।

ঝমঝম শব্দ। করিম শেখের ৬ষ্ট শ্রেণী পড়ুয়া কন্যা দৌড়ে আসলো। ঝমঝম শব্দের উৎস তার পায়ের নুপুর।
বাবা বড়ো শখ করে খেয়ে না খেয়ে গড়িয়ে দিয়েছিলেন। যে দিন বাজান এটা নিয়ে এসেছিলেন, সে দিন বাজান সুর করে বলছিলেনঃ কই রে আমার টুনটুনি, কই রে আমার ঝুনঝুনি; দেখ লো মা, তোর লিগ্যা কি আনছি। সে দিন তার চোখে তীব্র আনন্দে পানি চলে এসেছিল! নষ্ট হবার ভয়ে তুলে রেখেছিল। বাবা ছদ্মরাগে বলেছিলেনঃ আমার মা হাঁটে আওয়াজ পাই না ক্যা?

করিম শেখের কন্যা ব্যাংকের লোকের পা জড়িয়ে ধরলো। ব্যাংকের লোকদের ভাবান্তর হলো না এত কিছু দেখলে ব্যাংক চলে না, মাসিক টার্গেটেরই বা কি হবে? এদের নিজেদেরর মধ্যে চোখাচোখি হলো।
একজন বলেছিলঃ খুকি তোমার পায়ের নুপুরটা তো খুব সুন্দর তো, খুলে দাও তো, একটু দেখি। করিম শেখের কন্যা সরল মনে খুলে দিল। কিন্তু ওরা যখন অন্যান্য জিনিষের সঙ্গে এটাও নিয়ে গেল সে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
ভিড়ের মধ্যে তার স্কুলের মুখরা এক বান্ধবী বলেছিলঃ ভালা হইছে, স্কুলে এইটা পইরা গিয়া খুব রঙ্গ করতি, এহন রঙ্গ বাইর হইবো!
করিম শেখ সন্ধ্যায় ফিরে এলে, অনেক কিছুর সঙ্গে পাননি জমিতে দেয়ার জন্য ১টা কীটনাশক বোতল আর তার কন্যাকে।

গরমকাল। রাতের মধ্যেই জানাজা পড়ে কবর দিয়েছিলেন। মানুষটা শান্তই ছিলেন, চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই করেননি। শুধু তার কন্যাকে কবরে নামাবার সময় একবার কাতর গলায় বলেছিলেনঃ আহা, একটু আস্তে কইরা নামাও না, মায়াডা দুকখু পায় না বুঝি! করিম শেখ নামের শান্ত মানুষটা আরও শান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। জমি বিক্রি করে শোধ করে শুধু নুপুরটা নিয়ে এসেছিলেন, আর কিচ্ছু আনেনি।

ব্যাংকের লোকজনরা অনেক পীড়াপীড়ি করেছে। করিম শেখ অবিচল। এমন কি একবার লোক দিয়ে এরা গরু, ধানের বস্তা গ্রামে করিম শেখের বাড়ীতে নিয়ে এসেছিল। জোর করে রেখে যাওয়ার চেষ্টা করলে, করিম শেখের মতো শান্ত মানুষটা বটি দা নিয়ে হিংস্রভঙ্গিতে বলেছিলেনঃ আমার চোকখের সামনে থিক্যা দূর হ, নাইলে একটা কোপ দিমু।

ছোট একটা পত্রিকার সাংবাদিক এসেছিল। করিম শেখ দেখা করতে, কথা বলতে রাজী হননি। অন্যদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, ওই পত্রিকার মফঃস্বল বিভাগে খুব ছোট্ট করে এ খবরটা ছাপা হয়েছিল। গ্রামের ছেলেপুরেরা, তার ছাত্ররা বলেছিল, আপনে খালি একবার কন, ব্যাংক জ্বালায়া দিমু। করিম শেখ মাথা নেড়ে না করেছিলেন।

…প্রায় ২০ বছর পর। নামী এক পত্রিকার দুঁদে সাংবাদিক ঢাকা থেকে এসেছেন করিম শেখের সঙ্গে দেখা করতে। করিম শেখ দেখা করতেন না কিন্তু সঙ্গে এসেছে তার অতি প্রিয় ছাত্র, যে এখন ওই পত্রিকাতেই এখন চাকরী করে। এই সাংবাদিক অসম্ভব বুদ্ধিমান তিনি জানেন, এই নিউজের এই মুহূর্তে কী অপরিসীম মূল্য!
সাংবাদিক বললেন, ‘আপনার প্রতি ভয়াবহ অন্যায় হয়েছে। আমি আবার নতুন করে আপনার ওই খবরটা প্রথম পাতায় ছাপাতে চাই। আপনার মেয়ের ছবি থাকবে, সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎকার এবং ছবি।’
করিম শেখ বললেন, ‘এত্তো বছর পর আপনে এইটা নিয়া নাড়াচাড়া করতে চাইতাছেন ক্যান?’ সাংবাদিক খানিকটা থমকালেন, ‘অনেক বছর আপনি ন্যায় পান নাই… অনেক টাকাও আপনি পাবেন ।’
করিম শেখ তার ভারী চশমাটা মুছতে মুছতে বললেন, ‘বাবা, আমি একজন শিক্ষক, সামান্য লেখাপড়া জানি। বিষয় এইটা না, বিষয়টা হইলো গিয়া, যে ব্যাংক আমার প্রতি মহা অন্যায় করছিল ওই ব্যাংকের পরতিষ্ঠাতা অনেক বড়ো সম্মান পাইছেন। দুনিয়ায় আমাগো দেশের নাম আলোচনা হইতাছে। আমাদের মাথা অনেক উঁচা হইছে। আপনের পরতিকা চাইতাছে, ওই মানুষটারে কেমনে ছোড করা যায় কি বাবা, ভুল বললাম?’
সাংবাদিক তো তো করে বললেন, ‘আপনি কি আপনার মেয়ের কথা ভুলে গেছে, তার কথা ভেবে…।’

করিম শেখ এ প্রশ্নের উত্তর দিলেন না। উঠে গিয়ে ভেতর থেকে গিট দেয়া একটা রুমাল নিয়ে এলেন। নিমিষেই ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো ন্যাপথেলিনের সৌরভ। তিনি খুব যত্ন করে রুমালের গিট খুললেন। বেরিয়ে এলো কালচে রুপার ১টা নুপুর। করিম শেখ রুমাল দিয়ে অযথাই ঘসে ঘসে নুপুরটা চকচক করার চেষ্টা করছেন। তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ে নুপরটা ভিজে যাচ্ছে। করিম শেখ ভাঙ্গা গলায় বললেন, ‘দেশের সম্মানের থিক্যা বড়ো কিছু আর নাই। দেশের লাইগ্যা আমার ১টা মাইয়া কুরবানী দিলেই কী’!”

লেখাটি দিয়ে তোপের মুখে পড়েছিলাম। অনেক মন্তব্যের একটা নিয়ে বলি। হুবহু মন্তব্যটা, দাঁড়ি-কমাসহ, এখানে তুলে দিচ্ছি: “শুভ, চলেন, নোবেল কমিটিকে চিঠি দেই নোবেল প্রত্যাহারের জন্য। আপনি লিখে দেন, পোস্টেজ খরচ আমার”।
হা হা হা। প্রবাসী ওই মানুষটার শ্লেষ আমি খানিকটা ধরতে পারি। কালচে সবুজ রঙের পাসপোর্টটা নিয়ে শুভকে তো আর এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না। কালেভদ্রে, পাঁচ বছর পরপর পাসপোর্টটা বার করি রিনিউর জন্য, কোথাও যাওয়াই হয় না। (একবার ১টা ফ্রি টিকেট পেলাম, হোটেলের খরচসহ। ব্যাটারা আমার কাছে জানতে চাইল, কই যাইতে চাও? মালেয়শিয়া, না ব্যাংকক। আমি হাঁই তুলে বলি, দেখি। আমার দেখাদেখির পর্ব আর শেষ হয় না। মনে মনে ভাবলাম, ধ্যাত, ফ্যা-ফ্যা করে একা একা কোথায় ঘুরব। আফসোস, ওই টিকেটে এখন আর প্লেনে বসে যাওয়ার সুযোগ নাই- প্লেনে দাঁড়িয়ে গেলে সম্ভবত মানা করবে না- সিস্টেমটা সম্ভবত এখনও চালু হয়নি! )
তো, প্রফেসর ইউনুসের নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে জোর তর্ক-বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু এই একটা জায়গায় অভাবনীয় এক কান্ড ঘটে গেছে। বৈদেশীরা যখন কালচে সবুজ পাসপোর্টটার দিকে চোখ কুঁচকে তাকান আমাদের প্রতি অযথাই কালচে করে রাখা এদের মুখগুলো খানিকটা কমনীয় হয়ে উঠে। এই একটা মানুষ, এই অযাচিত সম্মানটা আমাদের এনে দিয়েছেন। ক্ষণে ক্ষণে সেলাম ঠুকেও আসলে এ ঋণ শোধ হয় না। এটা যে কী পাওয়া ভুক্তভোগী ব্যতীত অন্যদের অনুমান করতে পারা খানিকটা দুরূহ বটে।
তবে এও সত্য, ঝলসে ওঠা আলোর পেছনের অন্ধকারের কথা না বললেও অন্যায় হয় বৈকি। গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্যের পাশাপাশি অনেক অন্ধকার দিক আছে।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে এই লেখাটি লেখা হয়েছিল। মূল ঘটনা সত্য- মেয়েটি দুর্দান্ত অভিমানে আত্মহত্যা করেছিল। মেয়েটার নিথর দেহটা আমার নিজ চোখে দেখা। ক-রাত ঘুমের খুব সমস্যা হয়েছিল।

ফিকশনের জন্ম রিপোটিং-এর গর্ভে। এ লেখাতেও খানিকটা ফিকশন ছিল বৈকি। তখন বিভিন্ন ভাবে প্রফেসর ইউনুসকে অপদস্ত করার চেষ্টা ছিল। সলাজে বলি, আমার স্পষ্ট কিছু বক্তব্য ছিল, মানুষটার প্রতি, মাস্টারের কিছু কথায়- অন্তত শেষ অংশে। পুরনো মদ- সেলার থেকে বের করলে খুব একটা অন্যায় হবে বলে মনে করি না বলেই পুরনো লেখাটা এখানে তুলে দেয়া। আমার প্রিয় লেখা।  
সূত্র-আলী আহমেদ 

বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১০

মা এর কাছে অনাগত সন্তানের চিঠি

মা এর কাছে অনাগত সন্তানের চিঠি

আম্মু কেমন আছ? আমি খুব ভাল আছি!
মাত্র কয়েক দিন আগেই আমি তোমার গর্ভে এসেছি! বেড়ে উঠছি আস্তে আস্তে!
জানো আম্মু, তোমাকে আম্মু হিসেবে পেয়ে আমি যে কি প্রচন্ড খুশি হয়েছি! তোমাদের ভালবাসায় আমার জন্ম হবে, এটা আমার জন্য কতটা গর্বের? দেখ আম্মু, আমিই হবো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী বাবু!

১টা মাস দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল! জানো আম্মু, আমি এখন আমার দেহটাকে একটু একটু অনুভব করতে পারি! না না, এখনও দেখানো যাবে না, তেমন কিছু তো হই নি এখনও! আর কয়েকটা দিন সময় দাও, দেখবে আমি তোমাদের কত্তটা গর্বিত করব!

মা তোমার মন খারাপ কেন? কি এতো উল্টো-পাল্টা ভাবছ? আমার ভাল্লাগছে না তোমার এই মন খারাপ করা চিন্তাগুলো! দেখ সব ঠিক হয়ে যাবে!

আড়াই মাস পার হয়ে গেছে! জানো আমার এখন হাত হয়েছে, আমি এখন ওটা দিয়ে খেলতে পারি!

আম্মু কি হয়েছে আমাকে বলো? কেন এতো কাদছ তুমি? তুমি আর আব্বু কেন এতো রাগ করছ পরস্পরের উপর? তোমরা কি আমাকে আর চাও না আম্মু? কিন্তু দেখ আমি তোমাদের জন্য কত্তোকিছু করব! তোমরা আমাকে কত্ত ভালবাসবে, অনেক অ-নে-ক চাইবে আমাকে!

৩ মাস পার হয়ে গেল! কিন্তু আম্মু তুমি তো এখনও এত্তো মন খারাপ করে আছ? কেন আম্মু? আজকে তোমরা ডাক্তারের সাথে দেখা করে কালকের জন্য একটা সময় নিলে। কিন্তু কেন আমি এত্তো খুশি হলেও তোমার মুখ ভার?

কোথায় যাচ্ছ আম্মু? তুমি তো এরকম সময় ঘুমাও না! তাছাড়া আমারও তো খেলা শেষ হওয়া এখনও কত্তো বাকি?!

একি আম্মু? আমার ঘরে এটা কি জিনিস ঢুকাচ্ছে? এটা কি নতুন কোন খেলনা? একি, এটা তো আমার ঘরটাকে নষ্ট করে ফেলছে!

আম্মু তাদেরকে থামতে বল! এটা তো আমার হাত! এভাবে টানছে কেন, আমি ব্যথা পাচ্ছি তো! আমাকে বাচাঁও আম্মু, দেখ না আমি এখনও কত্ত ছোট, আমি নিজেকে বাচাতে পারি না। মা ওরা আমার পা ছিড়ে ফেলছে মা! আমাকে সাহায্য করো!

তাদেরকে থামাও মা! সত্যি বলছি, তাহলে আমি আর ওদেরকে লাথি মারব না! কেমন করে একজন মানুষ এরকম করতে পারে! আমাকে বাচাও মা! আমি আর পারছি না। আমাকে মেরো না!

মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ২০১০

একটি ভ্রুনহত্যার গল্প

আমি আজকাল প্রায় সকালেই দেরী করে ঘুম থেকে উঠিআজও দিবানিদ্রাতেই থাকার প্রাণপন প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলামকিন্তু ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো নোকিয়া ফোনের কড়কড় রিংটোনেসাধারণত এরকম ক্ষেত্রে আমি ঘুমের ভান করে পরে থাকিকিন্তু আজকের ঘটনা ভিন্নকারণ ফোনটা করেছে মুনিয়া খালাআমাকে যদি আমার দেখা পৃথিবীর দশজন ভালো মানুষের তালিকা করতে বলা হয় তাহলে আমি উনাকে এই তালিকাতে রাখতে পারবোনাআমার কাছে উনি কারো সাথেই তুলনীয় ননখালা আমাকে এতটাই ভালোবাসেন যে আম্মা মাঝে মাঝে উনাকে বলেন,"মুনিয়া আমার ছেলেরে তুই নিয়ে যা,তোকে আমি দিয়ে দিলাম" মজার ব্যাপার হলো উনি আমার আপন খালা নাবিভিন্ন লতায়-পাতায় পেঁচানো খালাপ্রকৃতির কি অদ্ভুত লীলা যার মনটা এত মায়া দিয়ে গাঁথা,তাকেই খোদা কখনো নিজের সন্তানের মা ডাক শুনতে দেননিখালার প্রথম সন্তান মারা যাওয়ার পর কি কারণে যেন উনি আর কখনোই মা হতে পারেননিখালার সেই সন্তানটি ছিলো ছেলে,যে পৃথিবীতে আসার পূর্বে নাম প্রাপ্ত হয়েছিলো অর্কএর কিছুদিন পর আমার জন্ম হলে এই খালাই আমাকে তার সন্তানের জন্য রাখা নামটি দেনশুনেছি জন্মের পর মুনিয়া খালা আমাকে নিয়ে যান কিনা এটা ভেবে আম্মা বেশ ভয়ে ছিলেনহয়তো তার হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে আমার মাঝে খুঁজে পান বলেই প্রতিবার বাসা থেকে বিদায় নেওয়ার আগে ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন,"আব্বা গেলাম,তুমি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া কইরোপড়াশোনা বাদ"

আসল কথায় ফিরে আসিআমি খালার ফোন ধরে সালাম দিতেই খালা কান্না কান্না কন্ঠে আমাকে অনেকগুলো কথা একসাথে বলতে লাগলেনঅস্পষ্টভাবে যা বললেন তাতে আমি যা বুঝলাম তা হলো,রিমি হাসপাতালেআজকে ওর abortion করা হয়েছেসমস্যা হয়েছে ওর জ্ঞান এখনো ফেরেনি

রিমির পরিচয় দেয়া দরকাররিমি আমার খালার পালিত কন্যাওকে দত্তক নেয়ার ঘটনাটা খুবই বিচিত্রখালার সন্তান মারা যাওয়ার পর খালা একটু কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলেনতখন ঘরের কাজের জন্য একজন বুয়া রাখা হয়বুয়ার মাসখানেক আগে একটা মেয়ে হয়েছিলোখালা বুয়ার বাচ্চাকে নিজের খাটে শুইয়ে ঘুম পাড়াতেন,কোলে নিয়ে রাখতেন,এমনকি খাইয়েও দিতেনখালু এই ব্যাপার নিয়ে মহা পেরেশান ছিলেনআমার আম্মাকে প্রায় বলতেন "আপা বুয়ার বাচ্চার জন্য আমি আজকাল ঘুমাইতে পারিনা,আমাকে আপনার বোন সোফায় ঘুমাইতে বলে নিজে বাচ্চারে আমাদের খাটে রেখে দেয়বলেনতো এইটা কিছু হইলো?"

দুঃখজনকভাবে বুয়া কাজ করার দুইমাস পরে তার শরীরে লিউকিমিয়া ধরা পড়েখালা শুধু বুয়ার কন্যাসন্তানটির জন্য হলেও বুয়ার অনেক চিকিৎসা করিয়েছিলেনকিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি মৃত্যুর কয়েকঘন্টা আগে হঠাৎ করে বুয়া খুব হাসতে শুরু করেএকসময় খালার হাত ধরে বলে,"আপনে কিন্তু ওর মা আছেন,আপনারে কীরা দিয়া গেলাম" আমার মমতাময়ী খালা এভাবেই রিমিকে পান রিমি আর আমার বয়স প্রায় সমানখুব বেশি হলে বছরখানেক ছোট হবেওর আপন মা মারা যাওয়ার পর খালা কখনো ওকে এতটুকু কষ্ট দিয়ে মানুষ করেননিআমরা এবং খালার আত্নীয়স্বজনদেরকে খালা প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন,উনাকে যদি কেউ আপন মনে করে তাহলে এই বাচ্চাকেও আপন ভেবে নিতে হবেএকবার আমার এক মামা কিছু একটা বলেছিলেন,মুনিয়া খালা চোখের পানি নাকের পানি এক করে তাকে ত্যাজ্য করেনওই মামা পরে রিমির জন্য ১০ কেজি চমচম কিনে খালার বাসায় রওনা হোনখালা তো তার দরজা খুলেননা কোনভাবেইপরে খালুজান অনেক কষ্টে খালাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মামার সাথে ভাব করায় দেনখালা শর্ত দিছিলেন,মামা যেন তার বাসায় কখনো মিষ্টি ছাড়া না আসেআমরাও মামার বদৌলতে প্রায়ই চমচম খেয়ে তৃপ্তিভরা ঢেঁকুর তুলতামউল্লেখ্য রিমির প্রিয় খাবার ছিলো চমচম

সবই ঠিক ছিলো,শুধু সমস্যা ছিলো খালুজানখালা মনে করতেন খালুজান রিমিকে আপন মেয়ের মত ভালোবাসেননাযদিও রিমি কখনো অভিযোগ করেনি,বরং খালুর সাথে দেখতাম তার বেশ ভালোই ভাবখালু তার এই পালক কন্যাকে কখনো একবারের জন্যও সামান্য ধমক দেয়নিতবুও খালা রিমিকে নিয়ে খালুজানকে প্রায়ই বকাঝকা করতেন

সেই রিমির চার মাস আগে আকদ হয়ে গেছে আর আজকে কি ভয়ঙ্কর কথা শুনলামআমি খালাকে হাসপাতালের নাম জেনে এখুনি আসছি কথা দিয়ে ফোন রাখলামএর এক ঘন্টা পর আমি মনোয়ারা হাসপাতালে রিমির কেবিনের পাশের খোলা বারান্দায় দাঁড়ানোআমার পাশে রিমির জামাই মুখ কাঁচুমাঁচু করে বসে আছেআমি তাকে মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করলাম, abortion এর সিদ্ধান্ত কেন নিলো! উনি আমার দিকে অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে বললো, "এখনো তো ঘরে তুলে নেইনিআম্মা বলছে অনুষ্ঠান করে বউ ঘরে নেবেনতাই অনুষ্ঠানের আগে বাচ্চা হয়ে গেলে সমস্যাএইজন্যই আর কি..."আমি এহেন জবাব শুনে হতভম্ব হয়ে গেলামতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেও আর ইচ্ছা হলোনাখালা আর খালুর পাশে যেয়ে দাঁড়ালাম খালা তখন অঝোরে কাঁদছে মেয়ের পাশে বসেখালু খালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চুপ করেআমাকে দেখে খালা কাছে টেনে এনে বসালেনতারপর কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, "তোমার খালুজানরে জিজ্ঞেস করো সে কেন কিছু করলোনাএখন আমার সাথে আহলাদ দেখায় বলে মেয়ের কিছু হবেনাকোনদিন এই লোক মেয়েটাকে নিজের মেয়ে ভাবেনাই" খালু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ায় বলে, "আমি কি করবো?তোমার মেয়ের জামাই এমন সিদ্ধান্ত নিলে ওদের মধ্যে আমি কি কিছু বলার হক রাখি?" খালা এবার রেগে গেলো, "তুমি আমার সামনে থেকে দূর হওতোমার মুখ দেখাও পাপ" খালু আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষন,তারপর কেবিনের বাহিরে হাঁটা দিলোখালা আমাকে এরপর জিজ্ঞেস করলো,নাস্তা করছি নাকিহালকা পাতলা কথা বললো

এর একটু পর রিমির প্রথমবারের মত সেদিন জ্ঞান ফিরলোখালা হন্তদন্ত হয়ে রিমির মাথার কাছে যেয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, "মা এখন কেমন লাগতেছে?ব্যাথা আছে?" রিমি একটা কেমন অসহ্য যন্ত্রনা নিয়ে খালার দিকে তাকালোতারপর খেব মৃদু কন্ঠে বললো, "আম্মু ভাইয়াকে অনেকদিন পর দেখলামও তো বোনের কথা একবারও ভাবেনা" আমি রিমির দিকে হাসি দিয়ে তাকিয়ে বললাম, "সময় পাইনারেবাসাতেও আজকাল থাকিনা তেমন" রিমির চোখ দিয়ে দেখলাম টপ টপ করে পানি পড়ছেআমাকে কান্না কান্না গলায় বললো, "ভাইয়া জানিস ডাক্তার না মানা করছিলো বাচ্চাটাকে না মারতে,আমি সকালে আসলে ডাক্তার আমাকে আল্ট্রাসনোগ্রাম করে দেখায় আমার বাচ্চার ছোট্ট মুখখানা,তার হৃদপিন্ডের ধুক ধুক শুনায়জানিস ভাইয়া অনেক ছোট্ট ছোট্ট হাত ছিলোএমন কেন হলো রে?আমার বাচ্চাটা কি কোনদিন আমাকে মাফ করবেরে ভাইয়া?আমি অনেক কাঁদছিলাম যেন বাচ্চাটাকে না মারে,কিন্তু আমার কথা কেউ শুনেনাইভাইয়া আমার বাচ্চাটা এখন কই আছে বলতো?বেহেশতে না ভাইয়া?"

আমি চোখের পানি ঢাকার জন্য কেবিনের বাহিরে চলে আসিপিছনে শুনলাম খালা অঝোরে কাঁদছেবাহিরে এসে শার্টের কোনা দিয়ে চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণএকটু স্বাভাবিক হলে পিছন ফিরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলামআমার খালুজান হাসপাতালের করিডোরের আরেক পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছেআমি উনার কাছে আস্তে আস্তে হেঁটে গেলামদেখলাম উনি রিমির আসল বাবা ফরিদ উদ্দিন সাহেবের কাঁধে হাত দিয়ে কান্নাভেজা চোখে এক গাদা কথা বলছেন "বুঝলা ফরিদ আমার মেয়েটাকে যখন স্কুল থেকে নিয়ে আসতাম তখন প্রায় সে মিস্টির দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতোপ্রতিদিন আমরা মিস্টির দোকানে যেয়ে একসাথে চমচম খেতামওর জন্য প্রতিরাতে চমচম কিনে আনতামওর মা ঘুমায় থাকতো,তখন আমি ওকে কোলে করে নিয়ে বারান্দায় ঘুরতাম আর মিস্টি ভেঙ্গে ভেঙ্গে মুখে দিতামও আমার কোলেই খেতে খেতে ঘুমায় পড়তোআজকে আমার এই মামুনীটা এভাবে হাসপাতালে শুয়ে আছে আর আমি ওর জন্য কিছু করতে পারছিনা" ফরিদ সাহেব মাথা নিচু করে খালুজানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিইয়ে বললো, "কাইন্দেন নাআমাগো মাইয়ার কিছু হইবোনা"

আমি এই দুই অশ্রসজল পিতার ভালোবাসার দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখলামকিছু সময় মানুষ অনুভূতিহীন হয়ে যায়আমারো ঠিক এই মুহূর্তে এমনটাই মনে হচ্ছিলোকত কথা মনে পড়ে গেলোআমার এস.এস.সি,এইচ.এস.সি পরীক্ষার সময় রিমি প্রতিদিন বাসায় এসে এটা-ওটা রান্না করতোআমাকে বলতো, "আমার ভাইয়া হলো সবসময় ফাস্টতাই এখন পরীক্ষার জন্য ওর খাবারও হবে ফাস্টক্লাস" আমি এসব ভাবতে ভাবতে মনে মনে বললাম , "বোনরে আমি কোনদিন ফাস্ট হইতে পারিনাইকিন্তু তুই সবসময় বোন হিসেবে আমার কাছে ফাস্ট ছিলি"

আরেকবার চোখে পানি মুছতে মুছতে খালার চিৎকার শুনতে পারলামআমি হুড়মুড় করে কেবিনের দিকে দৌড় দিলামদেখি রিমির শরীর কেমন কুঁকড়িয়ে যাচ্ছেহতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকলামডাক্তার ডেকে আনা হলোরিমির জামাই আফসার সাহেব ছুটাছুটি করতে থাকলেনডাক্তার সবাইকে রুম থেকে বাহিরে যেতে বললে আমরা কেবিনের বাহিরে জমায়েত হলামআমার খালা অঝোর ধারায় তখন কাঁদছে "আমার মেয়েটার এমন সর্বনাশ হয়ে গেলো আমরা কিচ্ছু করতে পারলাম নাকেমন ছেলের কাছে বিয়ে দিলামআজকে বিয়ে বাঁচাতে মেয়েটাকে মনে হয় মেরেই ফেললাম"...খালার এইসব কথা শুনে রিমির জামাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলোআমি উনাকে যেয়ে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলতে লাগলাম, "বউ বলে কি রিমির সাথে যা ইচ্ছা করার অনুমতি পায়া গেছেনওরে মানুষ মনে হয়না?নিজের বাচ্চারে এভাবে মারতে ঘৃনা হলোনা?" আমি এই কথা বলে সোজা হাসপাতালের বাহিরে চলে আসলামআমার কিচ্ছু তখন ভালো লাগছিলোনাকি অসহ্য এই মানব জীবনআমরা মানুষগুলো দিন দিন কেমন যেন অমানুষ হয়ে যাচ্ছিআজকে রিমির সাথে যা হয়েছে,সামাজিকতার দায়ে না জানি আর কত মেয়ের সাথে এমন হয়ে চলছে প্রতিদিন

রাত আটটার দিকে রিমির কেবিনে আমরা সবাইঅতিরিক্ত রক্তপাতের জন্য ওর অবস্থা তখন মুমূর্ষসেই সময় পান খেতে খেতে আবির্ভাব ঘটে রিমির শ্বাশুরীরউনি রিমির কপালে হাত দিয়ে বলেন, "এখুন কিমুন আছে মাইয়া?" খালা কটমট চোখে তাকিয়ে বলেন, "আমি যদি আগে জানতাম আপনারা আমার মেয়ের সাথে এই কাজ করবেন তাহলে..." রিমির শ্বাশুরী খালার দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে তুলে বলেন, "আমি কি জানতাম আপনার বাসায় আমার পোলা যায়া থাকে?আর মাইয়া তো বড় হইছিলোতার বুদ্ধি থাকলেইতো পোয়াতি হওয়া লাগতোনাআমার পোলাটাও যে বেকুব এইটাও খাটি সত্য" রিমির আসল পিতা ফরিদ সাহেব মহিলার দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করে বললো, "আমার স্যান্ডেলটা কিন্তু চামড়ার না প্লাস্টিকেরমুখে পড়লে দাগ যাইবোনাআমি যদি বুজতাম আগে,আমার মাইয়ারে বিয়া বইতে দিতামনাআপনার পোলারে থুতু দিয়া আসতাম" রিমির শ্বাশুরী এই কথার জন্য প্রস্তুত ছিলেন নাতিনি সাথে উঠে উঠে দাঁড়িয়ে গজগজ করতে করতে হাঁটা দিলেনপিছন থেকে তার ছেলে "আম্মা আম্মা" করে নপুংশকের মত হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে গেলো

রাত্রি নয়টায় রিমির জ্ঞান কিছুটা ফিরে আসেসে "আব্বু আব্বু" বলে ডাকা শুরু করেখালুজান রিমির খাটের পাশে বসে শক্ত করে ওর হাত ধরে আছেন যেন কেউ তার মেয়েকে তার থেকে কেঁড়ে নিতে না পারেরিমি খালুজানের আঙ্গুলগুলো আস্তে আস্তে দুর্বল ভাবে ধরে মৃদু কন্ঠে খালুকে আরো কাছে আসতে বললোওর দুর্বল গলার স্বর আমরা ঠিকই শুনতে পাচ্ছিলামকেমন যেন তীব্র হয়ে তা কানে বিঁধছে "আব্বু তুমি যে আমাকে মার থেকে বেশি ভালোবাসো এটা আমি কিন্তু জানিতোমার মনে আছে আমি যখন ছোট্ট কালে টাইফয়েড জ্বরে অজ্ঞান হয়ে ছিলাম,তখন তুমি সব কাজ রেখে সারাদিন আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরেছিলে?যে ভালোবাসা তুমি আর আম্মু আমাকে দিছো আমি হাজার জনমেও এর ঋণ শোধ করতে পারবোনাআমি মারা গেলে তুমি কিন্তু আম্মুর অনেক খেয়াল নিবাতুমি আর ভাইয়া ছাড়া আম্মুজানের কেউ নাইআর আব্বু আমার বাচ্চাটা খুব সুন্দর হইতো জানোওর তো বয়স দুই মাস হয়ে গেছিলোআমার মনে হতো,ও হালকা নড়াচড়াও করতোআমি ওর সাথে প্রতিদিন রাতে কত কথা বলছিগতরাতে ও আমাকে স্বপ্নে বলছিলো আম্মু আমার হার্ট ধুকধুক করেতুমি বেশি নড়াচড়া কইরোনা ঘুমের সময়"

আমার খালাখালু অসহায় চোখে রিমির পাশে বসে তার কথা শুনছিলোরিমি শ্বাস টেনে টেনে এতগুলো কথা অনেক কষ্ট করে কিভাবে বললো জানিনাআমি নিজের চোখের পানি আটাকাতে পারছিলাম নাসবাই রিমিকে বলছিলো ও যেন চুপ করে থাকেওর কিচ্ছু হবেনাকিন্তু আমি জানতাম,অনেক আগেই জানতাম এই নোংরা পৃথিবী ওর জন্য না

আমার জানাটা মিথ্যা ছিলোনারাত তিনটায় রিমি মারা যায়দিনটি ছিলো ১৯শে অক্টোবর,২০০৮মারা যাওয়ার আগে সে শেষবার আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, "ভাইয়া আমার বাবুর কাছে যাচ্ছিরে" আমি এখনও রিমিকে অনেক মনে করিআমার বোনটা কোথায় আছে,কেমন আছে জানিনাকিন্তু আমি সবসময় প্রার্থনা করি যেন আমার সকল পুণ্য ও আর ওর অনাগত সন্তানটি পায়ওর স্বামীকে আমরা কখনো ক্ষমা করিনিঅবশ্য সেও রিমিকে কবর দেয়ার পর থেকে কখনো আর আমাদের সামনে মুখ দেখায়নিশুনেছি ভদ্রলোক(?) এখন সুইডেনে আছেআরেকটা বিয়ে যে করেছে এটা না বললেও চলে আর আমার মুনিয়া খালা সারাদিন তার বাসার বারান্দায় বসে থাকেনকারো সাথে তেমন কথা বলেননাশুধু আমি বাসায় গেলে আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করেন,"তোরা সব এমন কেন?"এরপর কান্নাকাটি করেন অনেক, যা আমি সহ্য করতে পারিনা বলে নিজেই দুফোঁটা চোখের জল ফেলে বাসা থেকে বের হয়ে আসিপিছনে শুনতে পাই আমার খালু গম্ভীর কন্ঠে বলতে থাকেন, "কাইদোনা মুনিয়াআমার মেয়েটা কষ্ট পাবে"

[লিখায় বর্ণিত ভ্রুণহত্যার ঘটনাটি কল্পিত নয়নামগুলো আর কিছু চরিত্র পালটে দিয়েছিগল্পের রিমি মারা গেলেও বাস্তবের রিমি বেঁচে আছেকিন্তু যে মানসিক যাতনার সে স্বীকার হয়েছে তাকে বেঁচে থাকা বলে কিনা বলতে পারছিনাতার গুণধর স্বামীও তাই পার পেয়ে গেছেন এবং আপাতত ইউরোপে যাওয়ার জন্য ছোটাছুটি করছেনAbortion এর জন্য আমাদের দেশে অনেক মায়ের মৃত্যু ঘটনা অস্বাভাবিক নয়আমার জানামতে ব্যাপারটা খুবই কমনএই লেখাটা সেই মা আর তাদের অনাগত সন্তানের জন্যআরো বলে নিচ্ছি গল্পতে বর্ণিত অর্ক আমি নইঅর্ক সেই মানুষটি যার থেকে পুরো ব্যাপারটি জানা গেছেরিমি ও তার অনাগত সন্তানের জন্য সবাই আশা করি একবারের জন্য হলেও প্রার্থনা করবেনলেখার সময় আমার নিজের প্রতি বেশ ঘৃণাবোধ হয়েছেকারণ এই নোংরা সমাজের আমিও এক অংশ] ********************************************************************
সূত্র-আর্ক

শনিবার, ২৭ মার্চ, ২০১০

ভ্রুণহত্যা, বিড়ালহত্যা কিংবা মধ্যবিত্ত নিতিদিন

তন্দ্রার মনযোগ ভাঙে দূরের একটি ট্রাকের গর্জনে। সে মৃদু আলোর দিকে তাকায়,
খানিকটা দূরে, ট্রাকের আলোয় রাস্তার মাঝখানে শুয়ে থাকা একটি বিড়াল স্পষ্ট হয়।
সম্ভবত প্রচণ্ড গরমের কারণেই বিড়ালটি এমনভাবে রাস্তায় বসে আছে একটু খোলা
হাওয়ায় শীতল হবে বলে। বিড়ালটিকে তন্দ্রার আদর করতে ইচ্ছে করে, ভাবতে ভাবতে
ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে আসা দূরের ট্রাকটি মুহূর্তেই বিড়ালটিকে চাকায় পিষ্ট করে
আঁধার করে দিয়ে যায়। ল্যাম্পপোস্টের নিচে পড়ে থাকে ২৫০ ভোল্ট বাতির মৃদু আলো।
বিড়ালটির মৃত্যু তন্দ্রার ভারাক্রান্ত মনে একটু বড়সড় ধাক্কা দেয়, একি তবে বড়
কোন দুর্ঘটনার আভাস।
সুপ্ত'র সঙ্গে তন্দ্রার প্রেম করে বিয়ে হয়নি। ওদের বিয়েটা হয়েছিল
পারিবারিকভাবেই তবে বিয়ের আগেই তারা একে অপরকে দেখেছিল কয়েকবার। কলেজ
ক্যাম্পাসে দু'জনের প্রথম কথা হয়। লেকের ধারে বসে দীর্ঘক্ষণ নিরবতা শেষে
তন্দ্রার হাতে সুপ্তর স্পর্শ যেনো একরাশ কথার সজীবতা দিয়ে যায়। তারপর এই
সংসার; বিয়ের সময় অবশ্য তার দু'একজন বিবাহিত বান্ধবী পরামর্শ দিয়েছিল দেখিস,
পুরুষ মানুষের মন একটু বুঝে শুনে চলিস, সবকথা পুরুষকে বলতে নেই, সবকথা
পুরুষের ধাতে সয় না। কথাটি তন্দ্রার মূর্খ সংস্কৃতি মনে হয়, সবকথাই যদি বলা
না যায় তবে আর দুয়ের বন্ধন কেন!
ভাবতে ভাবতে রাত্রি দ্বি-প্রহর অতিক্রান্ত হয়েছে, তন্দ্রার চোখে ঘুম নেই, ঘুম
আসছেও না। ফলে দোতলার উত্তর দিকের জানালা খুলে দিয়ে সে বড় রাস্তার মৃদু আলোর
দিকে তাকিয়ে আছে। এ সময়ও হঠাৎ হঠাৎ মৃদু আলোয় মানুষের আসা-যাওয়া প্রত্যক্ষ হয়
আবার কখনও কখনও মালবাহী দু'একটি ট্রাকের গর্জন মনযোগ ভাঙে। এই তো ক্ষাণিক আগে
রাস্তার একটি বিড়ালকে চাপা দিয়ে গেছে একটি ট্রাক। ট্রাকের ড্রাইভারটি নিশ্চয়ই
একজন মানুষ কিন্তু কেমন মানুষ। এরকম ফাঁকা রাস্তায় কেউ এভাবে বিড়ালটিকে হত্যা
করতে পারে, নিজের কাছেই প্রশ্ন করে তন্দ্রা।
সুপ্ত সকালবেলা নাস্তা করে বেরিয়ে গেছে অফিসে, এখনও ফেরেনি। সবেমাত্র তিন-চার
মাস অতিক্রান্ত হয়েছে ওদের বিয়েরকাল। এখনি সুপ্তর মন বাইরে চলে গেছে, খুব
সাধারণ একজন মেয়ের মতো সেও এইকথা ভাবে। অথচ জীবনটাকে খুব সহজ করে নিয়েছিল সে
নিজের মতো। সারাটা জীবন কি তবে এভাবেই কাটাতে হবে, খুব আফসোস হয় তন্দ্রার।
তার বিবাহিত বান্ধবীদের কথা মনে পড়ে। ওদের কারও কারও বিয়ের বয়স তিন-চার বছর
পেরিয়ে গেছে তবু ওদের স্বামী সম্পর্কে মধুর কথা শোনে নিজেকে দুর্ভাগ্যবতী মনে
হয়। তার কষ্টটা বাইরে প্রকাশ করার মতো নয় নিজে কাছে সওয়া ছাড়া। কাকে বলবে সে,
সেই একটি ঘটনাই তাকে বারবার অবদমিত করে রাখে। কেন সে এমনটি করেছিল তার আজ কোন
যুক্তি খুঁজে পায় না। আজ তো জীবনের মানেই অন্যরকম বোধ হচ্ছে। নিজের কাছেই
নিজেকে আরও বেশি অপরাধী মনে হয়। তার কিবা দোষ ওটা তো বয়সজনিত ঘটনা, তাছাড়া সে
নিজেও বুঝতে পারেনি কিভাবে ওটা ঘটেছিল। আজ বুঝে, ওরকম আবেগ ও বিশ্বাস কখনও
কখনও ভাল নয়। পুরনো স্মৃতি তাকে ভারাক্রান্ত করে, কখন যে অতীতমন্থনে ডুবে যায়
তার মন সে নিজেও জানে না। একটি মুখোশ তার দিকে স্পষ্ট হয়ে এগিয়ে আসতে থাকে।
সে রাগে, দুঃখে মনে মনে ভাবে মুহূর্তেই আগুন জ্বালিয়ে দেবে মুখোশটির শরীরে,
কেন ওভাবে তাকে প্ররোচিত করেছিল।
ক্রমশ মুখোশটি অস্পষ্ট হতে হতে আবার ভেসে ওঠে বান্ধবীদের মুখ। আজ তাদের কথাই
সত্যি মনে হয় নইলে সেই ঘটনাটি শোনার পর থেকে সুপ্ত এত মনমরা হয়ে আছে কেন।
তন্দ্রার চোখে ঘুম এসে গিয়েছিল, আধোঘুমের লেশলাগা চোখেই সে রাস্তার দিকে
তাকায় এবং মুহূর্তেই তন্দ্রালু চোখ ভেঙে দিব্যজগতে ফিরে আসে সে। সুপ্তর আগমন
দৃশ্যটি আজ তার কাছে অন্যরকম মনে হয়। সুপ্ত কি আজ মাতাল হয়ে ঘরে ফিরছে।
সাধারণত এ অবস্থায় পুরুষরা মদটদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঘরে ফিরে। কলিংবেল বেজে ওঠার
আগেই সে নিচে গিয়ে দরজা খুলে দেয়, স্বচ্ছ হয়ে ওঠে সুপ্তর মুখ; কান্ত,
তন্দ্রালু আর হাজার প্রশ্নের বাণ যেন চোখ বেয়ে নেমে আসে তন্দ্রার দিকে। তার
ভীত শরীর হাল্কা গরম আর ভয়ার্ত প্রতিবেশে ঘামতে শুরু করেছে। সুপ্ত কোন কথা না
বলে ভেতরে প্রবেশ করে, দরজা বন্ধ করে পেছনে পেছনে দোতলায় ওঠে তন্দ্রা।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে কোট-টাই খুলে সুপ্ত। তন্দ্রার
ইচ্ছা হয়, প্রতিদিনের মতো আজো কোট-টাই খুলে দিতে কিন্তু সাহস হয় না। কোন এক
অক্টোপাস যেন শীতল করে রেখেছে তার হাত-পা-মুখ। হাল্কা ট্রাউজার পরে বাথরুমে
প্রবেশ করে সুপ্ত। ক্ষাণিক পর ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসে কিন্তু তার চোখে-মুখে
হাল্কা কান্তির ছাপ রয়ে গেছে, আয়নায় চুল আঁচড়িয়ে বিছানার দিকে যায় এমন সময়
কথা ফোটে তন্দ্রার।
টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে, খাবে চল।
খাব না, বলেই সুপ্ত বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে। তন্দ্রার রাতের খাবার খাওয়া
হয়নি, কথা না বাড়িয়ে সেও বিছানায় গা ছেড়ে দেয়, কিছুক্ষণ ভাবে কিছু জিজ্ঞেস
করবে কিনা? তারপর প্রশ্ন করে...
দুপুরে খেতে এলে না যে?
ইচ্ছে হয়নি, সুপ্তর সহজ উত্তর।
ক'দিন যাবত তুমি এমন করছ, কি এমন দোষ করেছি যে...। তন্দ্রার কথা শেষ হতে না
হতেই সুপ্তর স্বাভাবিক ঝাঁঝালো স্বর...
দেখ, এই মাঝরাতে কোন সিনক্রিয়েট করতে চাই না। যা হয়েছে তা মামুলি বিষয়, খুবই
স্বাভাবিক কিন্তু চেপে রাখা আরও বেশি অস্বাভাবিক। আমাকে তাই করতে হচ্ছে, এরকম
বিপাকে পড়তে হবে কোনদিন ভাবিনি আমি। এত রাতে রুমে বাতি জ্বালানো থাকলে,
বাবা-মা চলে আসতে পারেন। বাতিটা নিভিয়ে দয়া করে একটু শান্তিতে ঘুমোতে দাও।
তন্দ্রা আর কথা বাড়ায় না, ধীরে ধীরে ওঠে বাতিটা নিভিয়ে দেয়। তারপর শেষ রাত্রে
কখন যে ঘুমিয়ে গেছে দু'জন কেউ জানে না।
মন: মনুষ্য ধারাবাহিকতায় একটি জটিল বিষয়। মিরাকল। সে কখন কোথায়-যে যায় তার
কোন ঠিকানা নেই। বিড়াল, বারো ঘরের পাতিলের গন্ধ শুঁকে শেষে উগাড়ের ইঁদুর নিয়ে
যার রাত্রিবাস। এখানেই জীবনের সম্পর্ক জড়িত, আমাদের নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত,
উচ্চবিত্ত সবখানেই রয়েছে মনোবিত্ত কিংবা নেই। এই আছে ও নেই এর মধ্যে আমাদের
আজন্ম বসবাস, এই কথা হয়েছে জানা।
সুপ্ত ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু তন্দ্রার চোখে ঘুম নেই। ঘুম আসছে না। নুসরাত আপুর
কথা স্মরণ হয় তার। প্রতিবেশী। বড়বোন শুভ্রার বান্ধবী। বিয়ের কিছুদিন পর হঠাত
একদিন বাড়ির বাঁশঝাড়ে গলায় দড়িবেঁধে আত্মহত্যা করলো সে। সবাই অবাক, নুসরাত
এরকম করলো কেন? পরে, বাড়ির লোকজনের কানাঘুঁষায় আসল ঘটনাটি জেনেছিল তন্দ্রা।
নুসরাত তখন হাইস্কুলের ছাত্রী। ওদের বাড়িতে একজন গৃহশিক্ষক থাকতো। এই
শিক্ষকের সাথেই বাড়ির সকলের অজান্তে নুসরাতের প্রেমের সম্পর্ক হয়ে যায়।
সম্পর্ক এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একে-অপরের দেহদানে সঠিক হিসেবের অবকাশ
হয়নি কারোর। একসময় অসতর্ক নুসরাত সন্তান সম্ভবা হয়ে যায়। ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে
বাড়ির লোকজন জেনে গেলে কোন একরাতে নুসরাত-কে স্থানিয় এক হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে
এবোরশন করিয়ে আনে। ঘটনাটি প্রতিবেশী কেউ বুঝে ওঠার আগেই বাড়ির লোকজন ওই
গৃহশিক্ষক-কে বাড়ি থেকে বিদেয় করে দেয়।
তার বছর পাঁচেকের মধ্যেই বিয়ে হয় নুসরাতের। বিয়েরাতেই বরের কাছে ঘটনাটি
জানিয়ে দিয়েছিল নুসরাত। ঘটনাটি জানার পর ওর বর আর তাকে বউ হিসেবে রাখতে
চায়নি। ফিরতি নাইয়রের নামে নুসরাত-কে বাড়ি রেখে গিয়ে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে
দেয় ওর বর। অসহায় নুসরাত ভেবে কোনো কূলকিনারা করতে না পেরে শেষমেষ গলায় দড়ি
বেধে আত্মহত্যা করে।
শুভ্রাকে মানুষ বলে মনে হয় না তার। ওইরকম সময়েই তো অহনের সাথে তন্দ্রার
অনেকটা প্রেমের মতোই ঘটনাটি ঘটেছিল। অহন শুভ্রার ভাসুরের ছেলে। সুদর্শন যুবক।
ওইরাতের ঘটনাটি মনে পড়ে তন্দ্রার। শুভ্রার শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল।
রাতে তন্দ্রা আর অহন একসাথে ছিল। ছেলেটা খুব পাগল, অস্থির আর উত্তেজিত হয়ে
গিয়েছিল। তন্দ্রা নিজেও খুব সম্মোহিত আর চড়ম লোভী হয়ে ওঠেছিল সে রাতে। ভাবতে
ভাবতে খুবই লজ্জাক্রান্ত হয় তন্দ্রা। ঘুমন্ত স্বামীকে পাশে রেখে এসব ভাবতে
ভালো লাগে না তার। তাছাড়া তার চিন্তা ঘুমন্ত সুপ্ত আবার টের পেয়ে যাচ্ছে
নাতো! সে রাতের নিজস্ব আলোয় সুপ্তর দিকে তাকায়। সুপ্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে শুয়ে
আছে। ফ্যানের হালকা বাতাসেও সুপ্তর শরীর মৃদু ঘর্মাক্ত। নাকের ডগায় বিন্দু
বিন্দু জলের স্থির সন্তরণ। জনশ্রুতির কথাটি মনে হয় তার। যে পুরুষের নাক বেশি
ঘামে সে পুরুষ খুব বউ-আদরের হয়। সুপ্তকে আদর করতে ইচ্ছে হয় তার কিন্তু পারে
না। ঘুমন্ত স্বামীকে আদর করে দিতে কেমন যেন গর্হিত অপরাধবোধ আটকে রাখে তাকে।
মনে ভাবে, সুপ্তর মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে ওঠলে ওকে ইচ্ছেমতো আদর করে
প্রমাণ করবে জনশ্রুতির কথাটি আসলেই ঠিক।
অন্ধকারের আলোতেই মুখোশটির অস্তিত্ব টের পায় তন্দ্রা। মুখোশটি তার চারপাশে
ঘুরঘুর করতে থাকে আর প্ররোচিত করতে থাকে। পালিয়ে যা তন্দ্রা, পালিয়ে যা, দূরে
কোথাও। নইলে শান্তি পাবি না। পালাবার এখনই সময়। তন্দ্রা ভাবে সত্যি সত্যি সে
পালিয়ে যাবে কিনা। গেলে কেমন হয়? একেবারে অজানায়, দূরে, অনেক দূরে। নুসরাতের
কথা মনে হয় তন্দ্রার। তারমতো সেও কী দূরে কোথাও গিয়ে আত্মহত্যা করবে নাকি।
আবার ভাবে আত্মহত্যা করবে কেন? সে সুপ্তকে ভালোবাসে আর সুপ্তও তাকে, তাই তার
আত্মহত্যা করা ঠিক হবে না। অস্থির হয়ে ওঠে তন্দ্রা, তার শরীরও ঘামতে থাকে।
মুহূর্তেই সে মুখোশটিকে ধরে ফেলতে চায় কিন্তু ধরতে পারে না। অন্ধকারেই
মুখোশটি একবার তার পাশে আসে... একবার সোফায় গিয়ে বসে... একবার সুপ্তর
কম্পিউটার টেবিলে গিয়ে বসে... একবার জানালার পাশে দাঁড়ায়... একবার বারান্দায়
গিয়ে দাঁড়ায়... মুখোশটিকে সে যেন কিছুতেই ধরতে পারে না। ঘর্মাক্ত তন্দ্রা
বিছানা ছেড়ে টেবিলের দিকে যায়। জগভর্তি পানি থেকে একগ্লাস পানি খায় সে। তারপর
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। নির্জন রাস্তায় স্ট্রিট লাইটের ২৫০ ভোল্ট বাতির মৃদু
আলো আর ট্রাকচাপায় থেতলে যাওয়া বিড়ালটিকে দেখতে থাকে সে।
সকালে নাস্তার টেবিলে দুজনেই চুপচাপ থাকে যেন একে-অপরকে কেউ চেনে না।
অন্যান্য দিন তন্দ্রা নিজ হাতে ব্রেড-এ জেলি মেখে খেতে দিয়েছে কিন্তু আজ
দিচ্ছে না, নিজেও নিচ্ছে না। হঠাত সুপ্ত উত্তেজিত হয়ে কোনো সিনক্রিয়েট করে
ফেলে সেই ভয়। তন্দ্রা কী রাতে ঘুমিয়েছিল? বোধ হয় না, ওর চোখ দেখে বোঝা যায়।
হয়তবা রাতে কেঁদেও ছিল। নাস্তা সেরে সুপ্ত রমে ফিরে অফিস যাবে বলে প্রস্তুত
হয়েছে, এমন সময় তন্দ্রা এসে সামনে দাঁড়ায়।
তোমার সাথে কথা আছে।
বল, সুপ্ত'র উত্তর।
আমি বাড়ি যাব।
এবার সুপ্ত মনযোগী ভঙ্গিতে আরেকটু সামনে এগিয়ে তন্দ্রার মুখোমুখি হয়।
এখানে কী খারাপ লাগছে? হেভ য়্যু ফিল বোরিং হিয়ার!
এমন একটি সিরিয়াস বিষয়ে সুপ্ত'র হেয়ালিপনার অর্থ তন্দ্রা বুঝতে পারে না, সে
উত্তরহীন তাকায়।
ওকে, ওকে ইফ য়্যু ফিল বোরিং অর ডিজগাস্টিং দেন য়্যু কেন গো বাট নট উইদাউট মি।
আই ওয়ান্ট টু গো উইথ য়্যু ফর রিচড্ এন্ড এ পিচফুল এরেঞ্জমেন্ট ফর য়্যু দেয়ার।
হেভ য়্যু আন্ডারস্ট্যান্ড ডেয়ার অনারেবল মেডাম। এই বলে তন্দ্রার মুখটা
দু'হাতে একটু উঁচিয়ে ধরে নিজের খুব কাছাকাছি এনে সম্মোহনের মতো তাকায় সুপ্ত।
তন্দ্রা কিছু বুঝতে পারে না, সে সুপ্তর দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রথম দিনের মতো,
মহাজাগতিক জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে। ফাঁকে, কখন যে সুপ্ত তার ওষ্ঠে একটা চুম্বন
দৃশ্য এঁকে দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়, ঠাহর হয় না তন্দ্রার।
বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে গ্রামের মেয়েরা যে রকম বৃষ্টিতে ভিজে সজীবতা উপভোগ
করে, তন্দ্রাও সেই সজীবতা ফিরে পায়। বুঝতে পারে, কী ভুলটাই না সে করতে
বসেছিল। মতিভ্রমে মানুষের এরকমই হয়। তার মুখে তখনও ভাষা ফুটেনি, ইচ্ছে করে
দৌড়ে গিয়ে সুপ্তকেও সে একটি চুম্বন করে আসে কিন্তু পারে না, প্রথম দিনের মতো
বহুকালের অচেনা বোধ কাজ করে। আজন্ম নারীজনমের লজ্জাবোধ তাকে আটকে রাখে।
অফিসে ফিরেই সুপ্ত নিশ্চিত টেলিফোন করবে, তন্দ্রা জানে। তাই রুমেই থাকে, এদিক
ওদিক ছুটোছুটি করে, বই পড়ে, টেলিভিশন অন করে কিন্তু ভালো লাগে না, সিডি
প্লেয়ার অন করে লোপামুদ্রা মিত্রের গান শোনে 'ছেলেবেলার বৃষ্টি মানেই
আকাশজোড়া...' গরম পড়েছে তবু এই গান খারাপ লাগে না; স্মৃতিমন্থন হয়। ফ্যানটা
ছেড়ে সে উত্তরের জানালাটা পুনরায় খুলে দেয়। খুলতে খুলতে মনে পড়ে বড় রাস্তায়
গতকাল রাতে একটি বিড়াল ট্রাকচাপা পড়েছিল। তার থেতলে যাওয়া চিহ্ন এখনও স্পস্ট
হয়। বিড়ালটির কোনো দোষ ছিল না, সেই ভ্রুণটিরও... পুনরায় তার সেই ছায়াটির কথা
মনে হয় কিন্তু দিনের শ্বেতশুভ্র আলোয় তাকে দেখতে পায় না সে। তন্দ্রা জানে
এবার যদি তাকে সামনে পায় সে নিশ্চিত গলাটিপে হত্যা করবে।
Link - http://shortstory-simanto.blogspot.com/2009/07/blog-post_03.html